SPF আর PA+++ মানে কী: সানস্ক্রিনের লেবেল পড়ার নিয়ম
spf কি এবং কিভাবে কাজ করে — এক প্যারায় উত্তর: SPF মানে Sun Protection Factor, অর্থাৎ সূর্যের UVB রশ্মি থেকে সানস্ক্রিনটি কতটা সুরক্ষা দেয় তার মাপ। ল্যাব টেস্টের হিসাবে SPF 15 প্রায় ৯৩%, SPF 30 প্রায় ৯৭% আর SPF 50 প্রায় ৯৮% UVB আটকায়। বোতলের গায়ে পাশে লেখা PA+++ আলাদা মাপকাঠি — ওটা UVA ঠেকানোর মাত্রা, যে রশ্মি ট্যান, দাগ আর বয়সের ছাপ ফেলে।
সমস্যা হলো, দোকানে বা অনলাইনে সানস্ক্রিনের গায়ে আরও অন্তত পাঁচ-ছয়টা শব্দ থাকে — broad spectrum, water resistant 80 minutes, non-comedogenic, গোল বৃত্তে লেখা UVA। কোনটা কাজের তথ্য আর কোনটা নিছক মার্কেটিং, সেটা আলাদা করতে পারলে কেনাকাটার অর্ধেক ঝামেলা শেষ।
SPF-এর সংখ্যাটা আসলে কী বলে
SPF 30 মানে এই নয় যে আপনি ৩০ গুণ বেশি সময় রোদে থাকতে পারবেন। ওটা পুরোনো ব্যাখ্যা, আর বাস্তবে ভুল পথে নিয়ে যায়।
সংখ্যাটা আসে একটা নিয়ন্ত্রিত টেস্ট থেকে, যেখানে ত্বকের প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ২ মিলিগ্রাম প্রোডাক্ট মেখে দেখা হয় কতক্ষণে লালচে ভাব আসে। আপনি বাসায় ওই পরিমাণ লাগান না — এটাই মূল কথা। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Petersen ও Wulf-এর ২০১৪ সালের রিভিউ (Photodermatology, Photoimmunology & Photomedicine) বলছে, ব্যবহারকারীরা সাধারণত ওই মানের এক-চতুর্থাংশ থেকে অর্ধেক লাগান। ফলে বোতলে SPF 50 লেখা থাকলেও ত্বকে কার্যকর সুরক্ষা অনেক সময় SPF 15-এর ঘরে নেমে আসে।
তাই হিসাবটা সোজা: সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে পরিমাণ বাড়ানো বেশি লাভজনক। SPF 50-এর বোতল কিপটেমি করে লাগানোর চেয়ে SPF 30 বা 40-এর বোতল উদারভাবে লাগানো ভালো কাজ করে।
PA+ থেকে PA++++ — প্লাস চিহ্নগুলোর মানে
PA রেটিং জাপানের তৈরি। Japan Cosmetic Industry Association (JCIA) ১৯৯৬ সালে তিন ধাপের PA সিস্টেম চালু করে, যার ভিত্তি PPD (Persistent Pigment Darkening) পদ্ধতি — UVA পড়লে ত্বক কতক্ষণে কালচে হয়, তা মেপে হিসাব। পরে চতুর্থ ধাপ PA++++ যোগ হয়।
| লেবেল | PPD মান | UVA সুরক্ষা | কাদের জন্য |
|---|---|---|---|
| PA+ | ২–৪ | সামান্য | কার্যত এড়িয়ে যান |
| PA++ | ৪–৮ | মাঝারি | দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরে থাকলে |
| PA+++ | ৮–১৬ | ভালো | রোজ যাতায়াত, রিকশা-বাসে ৩০–৬০ মিনিট |
| PA++++ | ১৬+ | সর্বোচ্চ | দীর্ঘ সময় খোলা রোদে, মেছতা বা দাগের সমস্যা থাকলে |
ইউরোপীয় প্রোডাক্টে PA লেখা থাকে না; সেখানে গোল বৃত্তের ভেতর “UVA” ছাপা থাকে। ইউরোপীয় কমিশনের ২০০৬ সালের সুপারিশ অনুযায়ী ওই চিহ্নের মানে — UVA সুরক্ষা SPF-এর কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ। কোরিয়ান-জাপানিতে PA, ইউরোপীয়তে বৃত্ত, আমেরিকানে শুধু “broad spectrum” — তিনটাই একই প্রতিশ্রুতির তিন রকম প্রকাশ।
লেবেলের বাকি শব্দগুলো কী বোঝায়
- Broad spectrum: যুক্তরাষ্ট্রের FDA-র ২০১১ সালের চূড়ান্ত নিয়ম অনুযায়ী এই কথাটা লিখতে হলে প্রোডাক্টকে নির্দিষ্ট UVA টেস্ট পাস করতে হয়। শুধু SPF লেখা, broad spectrum বা PA কিছুই নেই — এমন বোতল তাকেই থাক।
- Water resistant (40 minutes / 80 minutes): পানিতে নামার বা ঘামার পর ওই কয় মিনিট পর্যন্ত SPF টিকবে, তার বেশি নয়। “Waterproof” বা “sweatproof” দাবি FDA-তে নিষিদ্ধ; কোনো বোতলে দেখলে বুঝবেন লেবেলটা পুরোনো বা দায়সারা।
- Non-comedogenic: লোমকূপ বন্ধ করার আশঙ্কা কম — নির্মাতার দাবি, বাধ্যতামূলক টেস্ট নয়। তৈলাক্ত ত্বকে ভরসা করার আগে নিজের ত্বকে দুই সপ্তাহ দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
- উৎপাদন ও মেয়াদ: কোরিয়ান প্রোডাক্টে অনেক সময় শুধু MFD থাকে, EXP থাকে না। খোলা কৌটার ছবির ভেতরে লেখা “12M” বা “6M”-ই তখন আসল সূত্র — খোলার পর কত মাস চলবে।
উপাদানের তালিকা দেখে ফিল্টার চেনার নিয়ম
লেবেলের পেছনে ingredients তালিকার প্রথম কয়েকটা নামই বলে দেয় সানস্ক্রিনটা কোন ঘরানার।
মিনারেল বা ফিজিক্যাল ফিল্টার: Zinc Oxide, Titanium Dioxide। ত্বকের ওপর স্তর তৈরি করে, লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে, সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া কম। খারাপ দিক — শ্যামলা ত্বকে সাদাটে আভা (white cast) পড়ে, আর গরমে ভারী লাগে।
কেমিক্যাল বা অর্গানিক ফিল্টার: Avobenzone, Octinoxate, Uvinul A Plus, Tinosorb S/M, Uvinul T 150। পাতলা, সাদা ভাব নেই, তাই দৈনন্দিন ব্যবহারে বেশি আরামদায়ক। এখানে একটা কৌশল আছে: Avobenzone একা থাকলে সে রোদে ভেঙে পড়ে, তাই Octocrylene বা Tinosorb-এর মতো স্টেবিলাইজার সঙ্গে আছে কি না দেখে নিন। কোরিয়ান-জাপানি ফর্মুলায় সাধারণত থাকে, কারণ ওই দেশগুলোয় অনুমোদিত ফিল্টারের তালিকা লম্বা।
শ্যামলা ত্বকে সাদা আভা এড়াতে চাইলে কেমিক্যাল বা হাইব্রিড ফর্মুলাই ব্যবহারিক পছন্দ। আর ব্রণের ওষুধ বা অ্যাসিড-রেটিনয়েড ব্যবহার করলে মিনারেল ফর্মুলা সাধারণত বেশি সহনীয়।
কতটুকু লাগাবেন, কখন লাগাবেন
এখানেই বেশির ভাগ রুটিন ভেঙে পড়ে। মাপটা মুখস্থ করে ফেলুন:
১. মুখের জন্য ১/৪ চা-চামচ (প্রায় ১.২ মিলি)। দুই আঙুলে — তর্জনী আর মধ্যমার গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত — দুটো লম্বা রেখা, এটাই সহজ মাপ। ২. গলা ও ঘাড়ে আলাদা ১/৪ চা-চামচ। মুখ এক রকম, গলা কালচে — এই তফাতের বড় কারণ এটাই। ৩. বের হওয়ার ১৫–২০ মিনিট আগে। সকাল ৮টায় রওনা দিলে ৭টা ৪০-এ লাগান। ফিল্মটা ঠিকমতো বসতে এই সময়টুকু লাগে। ৪. রি-অ্যাপ্লাই প্রতি ২ ঘণ্টা — তবে তখনই, যখন সত্যিই রোদে বা জানালার পাশে আছেন। সারাদিন এসি অফিসে বসা কারও জন্য দুপুর ১টার দিকে সানস্ক্রিন স্টিক বা পাউডার দিয়ে একবার টাচ-আপই যথেষ্ট; প্রতি দুই ঘণ্টায় পুরো মুখ ধুয়ে আবার লাগানোর পক্ষে আমি না। ৫. রাতে সানস্ক্রিন নয়। পি-এম রুটিনে ওটার কাজ নেই; বরং দিনের শেষে ভালো করে ক্লিনজিং দরকার।
দোকানে দাঁড়িয়ে ৬০ সেকেন্ডের চেকলিস্ট
- SPF 30 বা তার বেশি লেখা আছে?
- PA+++ / PA++++ অথবা broad spectrum অথবা বৃত্তে UVA — অন্তত একটা আছে?
- উপাদানের তালিকায় Avobenzone থাকলে সঙ্গে স্টেবিলাইজার আছে?
- ঘামের কাজ বা রোদে বেশি সময় হলে water resistant 40/80 minutes লেখা?
- মেয়াদ বা “12M” চিহ্ন স্পষ্ট, বোতলের সিল অক্ষত?
- টেক্সচার আপনার ত্বকে সহনীয় — জেল/ওয়াটারি নাকি ক্রিম?
বাংলাদেশের রোদে কোন লেবেলটা বাস্তবসম্মত
ঢাকার গ্রীষ্মে দুপুর ১১টা থেকে ৩টার UV ইনডেক্স নিয়মিত ৯–১১-এ ওঠে, শীতেও বেলা ১২টার দিকে ৬-৭ পাওয়া যায়। এই আবহাওয়ায় রোজকার ব্যবহারের যুক্তিসংগত সীমা: SPF 30-এর নিচে নয়, আর PA+++ বা তার বেশি। SPF 50+ PA++++ দরকার তখন, যখন দিনের বড় অংশ খোলা রোদে কাটে অথবা মেছতা-দাগ নিয়ে কাজ করছেন।
দাম কোথায় দাঁড়ায়, ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অনলাইনে যাচাই করা কয়েকটা রেফারেন্স:
| প্রোডাক্ট | লেবেল | দাম | যেখানে দেখা |
|---|---|---|---|
| Mamaearth Ultra Light Indian Sunscreen | SPF 50 PA+++ | ৳৯৫০ | shop.shajgoj.com |
| COSRX Aloe Soothing Sun Cream (50ml) | SPF 50+ PA+++ | ৳১,০৯৫ | arogga.com |
| Bioré UV Aqua Rich Watery Essence (50g) | SPF 50+ PA++++ | ৳১,১৮০ | arogga.com |
| Sinoz Sunscreen for Oily Skin | SPF 50+ PA++++ | ৳১,২৫০ | shop.shajgoj.com |
দাম আর স্টক ঘন ঘন বদলায়; কেনার আগে নিজে একবার দেখে নেবেন।
তালিকাটা সাজানোর পর একটা হিসাব চোখে পড়ে। ৳৯৫০ আর ৳১,২৫০-এর বোতলের মধ্যে লেবেলের পার্থক্য PA-র এক ধাপ, কিন্তু খরচের পার্থক্য প্রতি মাসে কয়েকশ টাকা। সঠিক পরিমাণে রোজ লাগালে ৫০–৬০ গ্রামের বোতল দেড় থেকে দুই মাসের বেশি চলে না — এই খরচের অঙ্কটাই অনেকের রুটিন ভাঙে। দেশি ব্র্যান্ডের SPF 40–50 সানস্ক্রিন ৳৪০০–৭০০-এর ঘরে পাওয়া যায়, আর আমদানি করা কোরিয়ান-জাপানি ফর্মুলা সাধারণত ৳১,০০০–২,১০০।
আমার অবস্থানটা স্পষ্ট করে বলি: PA-র এক ধাপ বাড়তি সুরক্ষার জন্য বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার দরকার নেই, যদি না বাইরে অনেকটা সময় কাটে। বরং যে বোতলটা রোজ সকালে হাত বাড়িয়ে নিতে ইচ্ছা করবে — হালকা, সাদা ভাব ফেলে না, চোখে জ্বালা ধরায় না — সেটাই আপনার জন্য সেরা সানস্ক্রিন। দামি বোতল ড্রয়ারে পড়ে থাকলে তার SPF শূন্য।
আরও পড়ুন: SPF 30 নাকি SPF 50 — কোনটা আপনার জন্য · তৈলাক্ত ত্বকের এ-এম রুটিন সাজানোর ধাপ · সানস্ক্রিনের দাম, বাংলাদেশ
প্রশ্নোত্তর
SPF 50 লাগালে কি ৫০ গুণ বেশি সময় রোদে থাকা যায়? না। SPF সংখ্যাটা সময়ের গুণিতক নয়, টেস্টে মাপা UVB সুরক্ষার মাত্রা। ঘাম, তেল আর হাতের ঘষায় ফিল্ম উঠে যায়, তাই খোলা রোদে থাকলে ২ ঘণ্টা পরপর আবার লাগাতে হয় — SPF যতই হোক।
PA+++ আর PA++++ এর পার্থক্য কি গায়ে লাগার মতো? PPD স্কেলে PA+++ মানে ৮–১৬, PA++++ মানে ১৬-এর বেশি — সুরক্ষা প্রায় দ্বিগুণ। রোজকার অফিস-যাতায়াতে PA+++ যথেষ্ট। মেছতা, মেলাজমা বা লেজার-পিলিং পরবর্তী ত্বকে PA++++ বেছে নেওয়ার যুক্তি আছে।
ঘরে থাকলেও কি সানস্ক্রিন লাগবে? জানালার কাচ UVB আটকায়, কিন্তু UVA-র বড় অংশ ঢুকতে দেয়। দিনের বেলা জানালার পাশে বসে কাজ করলে সকালে একবার লাগানো যুক্তিসংগত। পুরো দিন জানালাবিহীন ঘরে থাকলে বাধ্যতামূলক কিছু নয়।
ফাউন্ডেশন বা BB ক্রিমে SPF 20 আছে — আলাদা সানস্ক্রিন লাগবে? লাগবে। মেকআপে যতটুকু প্রোডাক্ট ব্যবহার হয়, তাতে লেবেলের SPF-এর ভগ্নাংশই পাওয়া যায়। মেকআপের SPF-কে বোনাস ধরুন, বিকল্প নয়।
রুটিনের কোন ধাপে সানস্ক্রিন? সকালের রুটিনে সবার শেষে — ক্লিনজার, টোনার বা সিরাম, ময়েশ্চারাইজার, তারপর সানস্ক্রিন। ময়েশ্চারাইজার শুষে যাওয়ার জন্য ২–৩ মিনিট সময় দিন; একসঙ্গে মেশালে ফিল্মটা অসমান হয়।
সানস্ক্রিন কি ব্রণ বাড়ায়? ভারী, তেলযুক্ত ফর্মুলা বাড়াতে পারে। তৈলাক্ত ত্বকে জেল বা ওয়াটারি-এসেন্স ধরনের টেক্সচার বেছে নিন, আর দিনের শেষে ভালো করে ক্লিনজিং করুন — সানস্ক্রিন মুখে রেখে ঘুমালে দোষটা প্রোডাক্টের নয়, রুটিনের।